রাজতন্ত্র মধ্যযুগের একটি বহুল প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা
যে শাসন ব্যবস্থায় কোন শাসক বংশানুক্রমে শাসন করার সুযোগ পান। রাজতন্ত্রী দেশের শাসককে রাজা, সুলতান, সম্রাট এবং শাহ আর নারী শাসককে রাণী বা সম্রাজ্ঞী বলা হয়ে থাকে। আজ থেকে প্রায় সাত-আট হাজার বছর আগে রাজতন্ত্রের সূচনা হয়।
রাজতন্ত্র মধ্যযুগের একটি বহুল প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা
রাজতন্ত্র হলো একটি শাসন ব্যবস্থা যেখানে দেশের শাসক একজন রাজা বা রাণী হয়ে থাকেন এবং ক্ষমতা সাধারণত বংশানুক্রমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসে। এই শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান একজন রাজপরিবারের সদস্য হয়ে থাকেন এবং তার হাতে শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষমতা থাকে। তবে কিছু রাজতান্ত্রিক দেশে সাংবিধানিক বিধিনিষেধের মাধ্যমে ক্ষমতা সীমিত রাখা হয়।
রাজতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র
রাজতন্ত্র মধ্যযুগের একটি বহুল প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা। সময়ের ব্যবধানে মানুষের মধ্যে অধিকার ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ক্রমান্বয়ে রাজতন্ত্রের অবসান হতে থাকে। তবে এখনো কিছু দেশে রাজতন্ত্রের প্রচলন আছে। কিছু সমৃদ্ধশালী ও উন্নত দেশ ঐতিহ্যগত কারনে রাজতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে। রাজতন্ত্র নাম থাকলেও দেশ চলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে।
রাজতন্ত্রে রাজ্যের সব সম্পদের মালিক রাজা। প্রজাদেরও মালিক তিনি। রাজা নিজেই যেহেতু সব সম্পদের মালিক তাই সেসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে উনি কারও কাছে জবাবদিহি করেন না। রাজ্য শাসনের জন্য উচ্চতর পর্যায়ে রাজা নিজ পরিবারের সদস্য ও বিশ্বস্ত অনুসারীদের নিয়োগ দেন। সাধারণ জনগণের দায়িত্ব রাজপরিবারের সেবায় নিয়োজিত থাকা।
প্রজাতন্ত্রে রাজ্যের সব সম্পদের মালিক হয় প্রজারা। রাজ্যের সব ক্ষমতার মালিকও হয় প্রজারা। প্রজারাই ঠিক করে কে কখন এ ক্ষমতা পাবেন এবং কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন। প্রশাসক প্রজাদের পক্ষে মালিকানার দায়িত্ব পালনে নিযুক্ত বেতনভূক্ত কর্মচারীর মতো। প্রজাতন্ত্রে রাজ্য পরিচালনার মূলমন্ত্র প্রজাদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও অবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে জবাবদিহির জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান থাকে। যেমন সংসদীয় পদ্ধতিতে রাজকার্যের প্রধান নির্বাহী বা সরকার এবং নির্বাহী বিভাগের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকে সংসদের উপর। এ বিষয়ে সাহায্যকারী পরবর্তী প্রতিষ্ঠান বিচার বিভাগ। বিভিন্নভাবে সহায়তা করে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও গণমাধ্যম ইত্যাদি।
চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে একনায়কতন্ত্র বহুলাংশে রাজতন্ত্রের মতো। একনায়ক শাসকেরা সব জবাবদিহির ঊর্ধ্বে অবস্থান নেন। স্থায়ীভাবে ক্ষমতা দখল ও ভোগ করেন। একনায়ক শাসক স্বৈরশাসক হিসাবে আবির্ভুত হন। স্বৈরশাসক রাজার মতো তাঁর নিজ পরিবারের সদস্যদের ও বিশ্বস্তদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতা বন্টন করে ভোগ করতে থাকে।
রাজতন্ত্রের বিভিন্ন রূপ
সাংবিধানিক রাজতন্ত্র বা সংসদীয় রাজতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র হল রাজতন্ত্রের একটি রূপ। যেখানে রাজা একা নয় বরং সংবিধান অনুযায়ী তার কর্তত্ব প্রয়োগ করে। একটি প্রতিষ্ঠিত আইনি কাঠামোর দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ক্ষমতা এবং কর্তত্ব প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভার্নন বোগড্যানর সাংবিধানিক রাজাকে ‘একজন সার্বভৌম যিনি রাজত্ব করেন কিন্তু শাসন করেন না’ বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
জাতীয় ঐক্যের দৃশ্যমান প্রতীক হিসাবে কাজ করার পাশাপাশি একজন সাংবিধানিক রাজা সংসদ ভেঙ্গে দেয়া বা আইন প্রণয়নে রাজকীয় সম্মতি দেয়ার মতো আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা রাখেন। এখানে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক অধিকার থাকে যেমন- পরামর্শ পাওয়ার অধিকার, উৎসাহিত করার অধিকার এবং সতর্ক করার অধিকার যা রাজা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারেন।
যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য কমনওয়েলথ রাজ্যগুলি হল সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থার ওয়েস্টমিনিস্টার সিস্টেমের সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। দুটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র যথা মালয়েশিয়া এবং কম্বোডিয়া হল ঐচ্ছিক রাজতন্ত্র, যেখানে শাসক পর্যায়ক্রমে একটি ছোট নির্বাচনী কমিটি দ্বারা নির্বাচিত হয়। আধা-সাংবিধানিক রাজার ধারণাটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রকে নির্দেশ করে।
প্রজাতন্ত্র বা গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে অনেক দেশ। ২০২৩ সাল পর্যন্ত অন্তত ৪৩ টি দেশে রাজতন্ত্রের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে সৌদি আরব দেশটি রাষ্ট্র বা রাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসিত করা বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই সৌদি আরবে রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বা নির্বাচনের ব্যবস্থা নাই। সংবিধান হিসাবে কোরআনকে গ্রহণ করা হলেও সেখানে রাজতন্ত্রই বিদ্যমান।
সাংবিধানিক রাজতন্ত্র
ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চর্লস এখন যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ আরও ১২ সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজা ও রাষ্ট্রপ্রধান। দেশগুলো হল- জ্যামাইকা, বারবাডোজ, বাহামাস, গ্রনাডা, পাপুয়া নিউগিনি, সলোমান আইসল্যান্ড, টুভালু, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট আ্যান্ড দ্য গ্রেনাদিনেস, আ্যান্টিগুয়া আ্যান্ড বার্বুডা, বেলিজ, সেন্ট কিটস আ্যান্ড নেভিস।
এই দেশগুলি ছাড়াও জাপান, থাইল্যন্ড, ভূটান, কম্বোডিয়াতে আছে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, এন্ডোরা, লেসোথো, টোংগা, লাক্সেমবার্গ ও স্পেনেও এই ধরনের রাজতন্ত্র বিদ্যমান। এইসব দেশের রাজারা আনুষ্ঠানিক কিছু দায়িত্ব পালন করেন, তবে রাজার কোন রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকে না।
ফেডারেল রাজতন্ত্র
মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছে ফেডারেল সুলতানের শাসন। একটি দেশের বিভিন্ন রাজ্যগুলিকে নিয়ে একজন রাজার রাজত্বই মূলত ফেডারেল রাজতন্ত্র। এই রাজতন্ত্রের অঙ্গরাজ্য সমূহের নিজস্ব সরকার ব্যবস্থা থাকে, আবার কেন্দ্রীয় সরকারও থাকে। রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে থাকেন রাজা। মালয়েশিয়া প্রতি পাঁচ বছর পরপর একজন রাজা নির্বাচিত করে।
পূর্ণ রাজতন্ত্র
সৌদি আরব, ভ্যাটিকান সিটি, ওমান, ইসওয়াতিনি দেশগুলিতে পূর্ণ রাজতন্ত্র বিদ্যমান। এই ব্যবস্থায় রাজার পূর্ণ এবং নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকে। আইন তৈরি, সংশোধন ও প্রত্যাখানও করতে পারেন। বিদেশে দেশের স্বার্থে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগ দিতে পারেন। অনেক গোপনীয় বিষয় প্রজাদের সামনে প্রকাশ করতে বাধ্য নয়।
মিশ্র রাজতন্ত্র
মরক্কো, জর্ডান, মোনাকো, লিকটেনস্টাইন, কাতারে প্রচলিত আছে মিশ্র রাজতন্ত্র। এই ব্যবস্থায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর একজন রাজা দেশের জন্য নির্দিষ্ট উপায়ে ক্ষমতা ভাগ করে দেন ও তাদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেন। বর্তমান সময়ে অনেকেই দাবি করেন, আধুনিক কালে রাজতন্ত্রের কোনো কার্যকারিতা নাই। রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত কোন বিষয় নয়।
ব্রিটেনে রাজতন্ত্র টিকে থাকার কারন
ব্রিটেনে রাজতন্ত্র টিকে থাকা একটি ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বিষ্ময়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্রিটিশ রাজতন্ত্র তার ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। ব্রিটেনে রাজতন্ত্র টিকে থাকার কারনগুলি নিম্নরূপ -
এক. ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব : ব্রিটিশ রাজতন্ত্র হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি ব্রিটেনের জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। রাজপরিবারের অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি এবং প্রতীকগুলো ব্রিটিশ জনগণের জন্য গর্বের বিষয়। উদাহরণস্বরূপ রাজকীয় বিবাহ বা রাজ্যাভিষেকের মতো অনুষ্ঠানগুলো শুধু ব্রিটেনেই নয়, সারা বিশ্বে আলোচিত।
দুই. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা : ব্রিটিশ রাজতন্ত্র একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করে যেখানে রাজা বা রাণী প্রধানত প্রতীকী ভূমিকা পালন করেন। এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। রাজতন্ত্রের উপস্থিতি সরকার ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে এবং দেশের ঐক্য বজায় রাখে।
তিন. অর্থনৈতিক সুবিধা : রাজতন্ত্র ব্রিটেনের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। রাজপরিবার পর্যটন শিল্পকে প্রাণবন্ত করে তোলে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক রাজকীয় প্রাসাদ যেমন বাকিংহাম প্যালেস বা টাওয়ার অফ লন্ডন পরিদর্শন করতে আসেন, যা ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বিলিয়ন পউন্ড যোগ করে।
চার. জনসমর্থন : ব্রিটিশ জনগণের একটি বড় অংশ রাজতন্ত্রের পক্ষে সমর্থন জানায়। রাজপরিবারের সদস্যরা জনসেবা ও দাতব্য কাজের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের দীর্ঘ শাসনামল এবং তার নিষ্ঠা ব্রিটিশ জনগণের মধ্যে রাজতন্ত্রের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে।
পাঁচ. আন্তর্জাতিক প্রভাব : ব্রিটিশ রাজতন্ত্র বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের নরম শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। কমনওয়েলথ অফ নেশনের প্রধান হিসাবে ব্রিটিশ রাজপরিবার বৈশ্বিক পর্যায়ে ব্রিটেনের প্রভাব বজায় রাখে। এটি ব্রিটেনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ছয়. পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ : ব্রিটেনে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করার জন্য বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন হয়েছে কিন্তু সফল হয়নি। এর মূল কারন হলো রাজতন্ত্রের প্রতি জনগণের আবেগ ও সমর্থন। ব্রিটিশরা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে চায়, যা রাজতন্ত্রের টিকে থাকাকে নিশ্চিত করে।
ব্রিটেনে রাজতন্ত্র টিকে থাকার পিছনে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারন জড়িত। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই নয় বরং ব্রিটিশ জাতির আবেগ, ঐতিহ্য এবং গর্বের প্রতীক। ভবিষ্যতেও রাজতন্ত্র ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় অস্তিত্ব হিসাবে টিকে থাকবে বলে মনে করা হয়।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url