ফ্যাসিবাদে রাষ্ট্রই সকল ক্ষমতার অধিকারী, ব্যক্তি নয়
ফ্যাসিবাদের মূলনীতি জনগণের জন্য রাষ্ট্র নয় বরং রাষ্ট্রের জন্য জনগন। রাষ্ট্রই সকল ক্ষমতার অধিকারী, ব্যক্তি নয়। ফ্যাসিবাদ নিজে কোনো মতাদর্শ নয়। যে কোন মতাদর্শের কাঁধে সওয়ার হয়ে ফ্যাসিবাদ কায়েম হতে পারে। জাতীয়তাবাদের কাঁধে সওয়ার হওয়াই সর্বাধিক সহজ প্রবণতা।
ফ্যাসিবাদ র্যাডিক্যাল কর্তত্বমূলক জাতীয়তাবাদের একটি রূপ
এক নেতা, এক দল, একটি মাত্র মতাদর্শ ভিত্তিক একচ্ছত্র স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা। নাগরিকদের নিপীড়ন আর হিংস্রতায় দেশ ও জাতিকে ভয়ের চাদরে ঢেকে দেয়া। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রই সব, সবকিছুই রাষ্ট্রের জন্য, রাষ্ট্র এক কর্তৃত্ববাদী ও সর্বগ্রাসী অস্তিত্ব। মানুষের ব্যক্তিগত ও মানবিক অধিকার রাষ্ট্রের বেদিমূলে বলি দেওয়া।
ফ্যাসিবাদ হচ্ছে র্যাডিক্যাল কর্তত্বমূলক জাতীয়তাবাদের একটি রূপ। যা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপে খ্যাতি লাভ করে। ১ম বিশ্ব যুদ্ধের পর ইতালিতে ফ্যাসিবাদ উৎপত্তি লাভ করে। ইতালিতে ১৯১৯ সাল থেকে ৪৫ সাল অবধি মুসোলিনি Fascismo নামে যে মতাদর্শ ও আন্দোলনের সূত্রপাত করেন তার ইংরেজি প্রতিশব্দ হল Fascism বা ফ্যাসিবাদ।
সাধারণভাবে ফ্যাসিবাদ বলতে যে কোন ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী, অগণতান্ত্রিক, উদারতাবাদ ও সমাজতন্ত্রবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিকেই বোঝানো হয়ে থাকে। ঐতিহাসিক অর্থে দুই বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ইতালির একনায়ক মুসোলিনির আদর্শকেই ফ্যাসিবাদ বলা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে তীব্র হতাশা ও তিক্ততার পটভুমিতে এই ভাবাদর্শের জন্ম।
ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি ও তাৎপর্য
ফ্যাসিবাদ শব্দটি ইতালীয় শব্দ Fascismo থেকে উদভূত যা Fascio শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ লাঠির বান্ডিল, যা প্রাচীন রোমান প্রতীক Fasces থেকে উদভূত। এই প্রতীকটি একাধিক লাঠির বান্ডিলের সাথে একটি কুড়ালকে ঘিরে রাখা হতো, যা শক্তি এবং ঐক্যের প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হতো। ফ্যাসিবাদের মূল আদর্শ একদলীয় শাসন, যেখানে জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃত্ববাদ প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ফ্যাসেস প্রতীক ঐক্যের মাধ্যমে শক্তির ধারনা প্রকাশ করে। একটি একক লাঠি সহজেই ভেঙ্গে যায়, কিন্তু লাঠির বান্ডিল ভাঙ্গা অনেক কঠিন। এই প্রতীকটি বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, স্পেনের ফ্যালাঞ্জ প্রতীক ছিল একটি জোয়ালের মাধ্যমে সংযুক্ত পাঁচটি তীর। হিটলার এবং মুসোলিনি এই প্রতীককে ব্যবহার করে শক্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন।
ফ্যাসিবাদের জন্ম এবং উন্নয়ন
ফ্যাসিবাদ প্রথম উদ্ভব ঘটে ইতালিতে। ১৯১৫ সালে মুসোলিনি ইতালিতে ফ্যাসেস অফ রেভোলিউশনারি আ্যাকশন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৯১৯ সালে মুসোলিনি মিলানে ইতালীয় ফ্যাসিস অফ কমব্যাট গঠন করেন। দুই বছরের মধ্যেই এটি জাতীয় ফ্যাসিস্ট পার্টিতে রূপান্তরিত হয়। এই ব্যবস্থাটি একটি কর্তৃত্ববাদী এবং জাতীয়তাবাদী ডানপন্থি ব্যবস্থা হিসাবে পরিচিত।
ইতালিতে ফ্যাসিবাদ প্রথম শুরু হলেও এটি জার্মানি, স্পেন এবং অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জার্মানিতে হিটলারের অধীনে নাৎসি শাসন এবং স্পেনে ফ্রাংকোর শাসন ফ্যাসিবাদী আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের এই ধরণগুলি বিশ্বে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারন হয়। এটি বিশ্বযুদ্ধ এবং গণহত্যার মতো ঘটনা ঘটায় যা মানুষের জীবনে চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায়।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে, ফ্যাসিজম হচ্ছে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং গণআন্দোলন, যেটি ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সদর্প উপস্থিত ছিল। এই মতাদর্শে বিরোধীদের কোন জায়গা ছিল না। কর্তৃত্বময় শাসন ক্ষমতাই ছিল ফ্যাসিবাদের মূলমন্ত্র। ব্যক্তি স্বাধীনতা হরন করে ক্ষমতাকে একটি কেন্দ্রে আবদ্ধ রাখতো।
মুসোলিনি ছিলেন এক স্কুল শিক্ষক, একজন প্রথাবিরোধী লেখক, সমাজতন্ত্রের পক্ষে একজন বক্তা এবং পত্রিকার সম্পাদক। ক্ষমতায় আসার ১৬ বছর পর্যন্ত মুসোলিনির মধ্যে ইহুদি-বিরোধী কোন মনোভাব ছিল না। ইহুদি শিল্পপতি ও জমির মালিকরা প্রথম দিকে মুসোলিনিকে সহায়তা করেছিল। ফ্যাসিস্ট পার্টি ক্ষমতা নেয়ার পর সমাজতন্ত্রীদের ওপর বেশি চড়াও হয়েছে।
ফ্যাসিস্টদের বৈশিষ্ট্য
ক্ষমতায় আসার পর ফ্যাসিস্টরা ধর্মঘট নিষিদ্ধ করে, শ্রমিক সংগঠনগুলো ভেঙ্গে দেয় এবং অস্ত্র বানানোর খাতে প্রচুর অর্থ ব্যায় করে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ ধারন করা ইউরোপের বড় রাজনৈতিক দলগুলো ভেঙ্গে যায়। ইতালি এবং জার্মানিতে ফ্যাসিস্ট দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। হিটলালের পার্টিও ফ্যাসিস্ট পার্টি হিসাবে পরিচিত ছিল।
ফ্যাসিস্টরা মার্ক্সবাদীদের বিরোধী ছিল। তবে ফ্যাসিস্ট এবং সোভিয়েত কমিউনিজমের মধ্যে অনেক মিল ছিল। ফ্যাসিজম এবং সোভিয়েত কমিউনিজম-দুটাই এসেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভঙ্গুর অর্থনৈতিক দশা, গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে। ফ্যাসিস্টরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
হিটলার ক্ষমতায় এসে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাই নিয়ন্ত্রণ করেনি, এর পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কর্তত্ব স্থাপন করেছিল। জনসমাবেশ করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করা ফ্যাসিস্ট দলগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য। সবসময় এক ব্যক্তির সর্বময় কর্তত্ব ও শাসনে বিশ্বাস করতো। দল ও রাষ্ট্রের প্রধান একই ব্যক্তি থাকবেন। যার হাতে সর্বময় ক্ষমতা থাকবে।
হিটলার ও মুসোলিনি যেটা মনে করতেন সেটাই সবাইকে মানতে হবে। তরুনদের শক্তি ও সামর্থকে সবসময় প্রশংসা করতো ফ্যাসিস্টরা। তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তরুনদের মাতিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। সমালোচনার জবাব দিতেন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। যে কোন সমস্যাকে অন্যের ওপর দোষ চাপাতে পছন্দ করতেন। এজন্য তারা কাউকে না কাউকে বলির পাঠা বানাতেন।
ফ্যাসিবাদ হল একটি কট্টর ডানপন্থী, কর্তৃত্ববাদী, গোড়া জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং আন্দোলন। কোন রাজনৈতিক দল বা আন্দোলনের কয়েকটি মূল বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে ফ্যাসিবাদী বলা যাবে। যেমন-
- একজন একক শক্তিশালী স্বৈরশাসকের দ্বারা পরিচালিত হয়।
- সরকার এবং সমাজের সবকিছুর উপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ রাখেন
- ভিন্নমত বা বিরোধিতাকারীদের প্রতি কোনরূপ সহনশীলতা দেখানো হয় না।
- অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করা হয়।
- বিরোধীদের চুপ করাতে বা দমন করতে সহিংসতা ও ভয়ভীতি ব্যবহার করে।
- সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং নিম্ন আয়ের মানুষরা বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়।
- শাসক গোষ্ঠীর স্বার্থকে নাগরিকের স্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
- অর্থনীতি, শিক্ষা এবং মিডিয়ার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
- নিজস্ব জাতি ও সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্বের উপর জোর দিয়ে অন্য জাতি ও সংস্কৃতির প্রতি শত্রুতার দিকে পরিচালিত করে।
- ফ্যাসিস্টরা সহিংসতা, সাম্রাজ্যবাদ এবং যুদ্ধকে বৈধ হাতিয়ার হিসাবে বিশ্বাস করে।
- জনমতকে প্রভাবিত করতে সবসময় প্রচার প্রোপাগান্ডা করে।
- নেতাকে একজন অদম্য নায়ক হিসাবে চিত্রিত করে এবং ভিন্নমতকে নিরুৎসাহিত করে।
- শিক্ষাকে তারা তাদের কর্তৃত্বের জন্য হুমকি হিসাবে দেখে। তাই শিক্ষাকে নিম্নমুখী করে।
- ফ্যাসিবাদে প্রায়শই একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতাকে ঐক্য ও শক্তির প্রতীক হিসাবে দেখা হয়।
একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে ফ্যাসিবাদ কোন একচেটিয়া মতাদর্শ নয়। এটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং স্বতন্ত্র নেতার উপর নির্ভর করে পরিচালিত হতে পারে। একনায়কতন্ত্রের প্রতি সমর্থন দেন। ব্যাক্তি স্বাধীনতার উপর নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন করে। তবে উপরে উল্লিখিত মূল উপাদানগুলি সমস্ত ফ্যাসিবাদী শাসনের জন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
একটা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় সাধারণত একনায়ক বা একক দলের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সামরিক শক্তির প্রতি অতিরিক্ত শ্রদ্ধা দেখান। বিক্ষোভ দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক বিরোধিতার অধিকার দমন করার জন্য সব রকমের ব্যবস্থা করে থাকে। রাষ্ট্রের স্বার্থ সবকিছুর উপরে রাখা হয়। অর্থাৎ একনায়কের সমর্থকদের স্বার্থকে বোঝানো হয়।
ফ্যাসিবাদ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়েছে। তবে ইতালি, জার্মানি ও স্পেন প্রভৃতি দেশের উদাহরণ থেকে আমরা ফ্যাসিবাদ বোঝার জন্য কিছু মূল উপাদান পাই। সেই মূল উপাদানগুলো নিয়ে প্যাক্সটন বলেন, ফ্যাসিস্ট আন্দোলনগুলোর জন্য সাধারণভাবে চরম জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্রের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলেন জন্য সহিংসতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
ফ্যাসিবাদ গণমানুষের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একটি চরম জাতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। জনগণের একটি বড় অংশ অন্য জাতি বা গোষ্ঠীর প্রতি শত্রুতা পোষণ করেন। সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈরিতা ছড়ান ও বৈষম্যমূলক আচরন করেন। নারীর ভূমিকা সীমিত করে এবং তাদের প্রধানত মাতৃত্ব ও পরিবার দেখাশোনার দায়িত্বে রাখতে চান।
ফ্যাসিবাদ এত সহজে যায় না
ফ্যাসিবাদ যেমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তেমনি সমাজ থেকে ফ্যাসিবাদ নির্মূল করতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়। ফ্যাসিবাদ দুর করতে হলে উদারনৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করা।
সত্যিই যদি ফ্যাসিবাদের ফিরে আশা বন্ধ করতে চাই তবে আমাদের কাজ করতে হবে বহুত্ববাদী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য। সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে স্বীকৃতি দিয়ে জাতি ও ধর্মগত সব সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অধিকারের সুরক্ষা দিতে হবে। সবাইকে সমান সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে সমাজে ঐক্য বজায় রাখার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ দুরে রাখা যায়।
কেবলমাত্র বৈষম্যমুক্ত সমাজই পারে ফ্যাসিবাদী আদর্শের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী সরকার যে নির্যাতন করেছে, নাগরিকদের হত্যা করেছে সেই বর্বরতা এবং নির্মমতার ইতিহাস সব স্তরের জনগণকে দেখাতে হবে, যাতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যায়। শেষ পর্যন্ত সচেতন জনগণই রুখতে পারে ফ্যাসিবাদ।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url