ঈসা খাঁ ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইয়া সর্দারদের একজন

ঈসা খাঁ ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইয়াদের একজন। তিনি ১৫৭৬ - ১৫৯৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা জেলার অর্ধাংশ প্রায় সমগ্র ময়মনসিংহ জেলা এবং পাবনা, বগুড়া, রংপুরের কিছু অংশ স্বাধীনভাবে জমিদারী স্থাপন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র মুসা খাঁ জমিদারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ঈসা খাঁ ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইয়া সর্দারদের একজন

ঈসা খাঁ ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইয়া সর্দারদের একজন


ঈসা খাঁ ১৬ শতকের বাংলার বারো ভূঁইয়া সর্দারদের একজন ছিলেন। তিনি সোনারগাঁও অঞ্চলের জমিদার। তাঁর শাসনামলে তিনি সফলভাবে বাংলার ভূস্বামীদের একত্রিত করে বাংলায় মুঘল আক্রমণ প্রতিহত করেন। ঈসাঁ খাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বাংলায় দুই দশকেরও বেশি সময় মুঘলরা শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। তবে তাঁর মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ মুঘলদের অধীনে চলে যায়।

ঈসা খাঁনের বাড়ি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে অবস্থিত। তিনি ১৫২৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে জন্ম গ্রহণ করেন। মধ্যযুগীয় বাংলার একজন প্রভাবশালী স্বধীনতাকামী হিসাবে ঈসা খাঁ আজও বাংলাদেশে সমাদৃত। সম্রাট আকবর বাংলা বিজয়ের পর ভাটি অঞ্চলের সুরক্ষার জন্য বাংলার প্রভাবশালী জমিদারদের একত্রিত করে মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন, যারা বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত।

ঈসা খাঁর প্রারম্ভিক জীবন


ঈসা খাঁনের দাদা ভগীরথ বাইস গোত্রের রাজপুত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি অযোধ্যা থেকে বাংলায় আসেন এবং বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ এর অধীনে দেওয়ানের চাকরি নেন। তাঁর পুত্র কালিদাস গজদানি তাঁর মৃত্যুর পর এই পদটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে গজদানি ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে সোলেমান খাঁ নামে নতুন নামে পরিচিত হন।

ঈসা খানের পিতা সোলেমান খা, সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ’র মেয়ে সৈয়দা মোমেনা খাঁতুনকে বিয়ে করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের জমিদারি লাভ করেন। এ সরাইলেই সোলেমানের পুত্র ঈসা খান জন্মগ্রহন করেন। গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর জামাতা সোলায়মান নিজেকে বৈধ উত্তরাধিকারী দাবি করেন। তার রাজ্য শাসনের কেন্দ্র বিন্দু ছিল সরাইল।

১৫৪৫ সালে শের শাহ সুরির পুত্র ইসলাম শাহ সুর সাম্রাজ্যের সম্রাট হবার পর সোলেমান খান সম্রাটের আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাঁকে হত্যা করে তাঁর দুই পুত্র ঈসা খান ও ইসমাইল খানকে একদল তুরানি বণিকের নিকট বিক্রি করা হয়। ঈসা খানের চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্ত হয়ে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে দুই ভ্রাতুস্পুত্রকে উদ্ধার করেন। এ সময় ঈসা খানের বয়স ছিল ২৭ বছর।

ক্ষমতায় আরোহণ


বাংলার সুলতান তাজ খান কররানী ১৫৬৪ সালে সিংহাসনে বসে ঈসা খানকে তাঁর পিতার জমিদারি ফেরত দেয়া হয়। ১৫৭৩ সালে তিনি দাউদ খান কাররানীকে ত্রিপুরার মহারাজা উদয় মানিক্যের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম অভিযানে সহায়তা করেন। সোনারগাঁও সংলগ্ন এলাকা থেকে মুঘলের নৌবাহিনীকে বিতাড়িত করতেও দাউদ খানকে সহায়তা করেছিলেন।

সামরিক অভিযান


১৫৯৭ সালে বিক্রমপুর হতে ১২ মাইল দুরে ঈসা খান মাসুম খান কাবুলির সম্মিলিত বাহিনী দুর্জন সিংহকে বাধা দিলে দুর্জন সিংহ বহু মুঘল সৈন্য নিহত হন এবং অনেকে বন্দী হন। তবে এই যুদ্ধের পর ঈসা খান মুঘলদের সাথে বন্ধুত্ব করেন। আগ্রায় গিয়ে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত করেন। সম্রাট আকবর তাঁকে দেওয়ান ও মসনদ-ই-আলা উপাধিতে ভূষিত করেন।

বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম নেতা ঈসা খাঁ মুসলিম বাঙালি বীরের প্রতীক ছিলেন। বাংলার ইতিহাসে বারো ভূঁইয়া আমল একটি গৌরবোজ্জল অধ্যায়। কারন এই বারো ভূঁইয়ারা ছিলেন স্বাধীনচেতা বীরযোদ্ধা। তারা দিল্লির সম্রাটদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে প্রায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন। দিল্লির সুলতানরা ও মুঘল বাদশারা বাংলাকে নিজেদের শাসনাধীনে রাখতে সবসময় চেষ্টা করে গেছেন।

ঈসা খানের জীবদ্দশায় মুঘল সম্রাট আকবর পূর্ব বাংলার ভাটি অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। এ সময়ে ঈসা খান ভাটির বিশাল অংশে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সে অঞ্চলকে একটি স্বাধীন রাজ্যে পরিণত করেন। সূত্র মতে, সে সময় ভাটি অঞ্চলের ২২ টি পরগনা সরাসরি ঈসা খানের শাসনাধীন ছিল। বাংলা কখনো দিল্লির অধীন আবার কখনো স্বাধীন ছিল।

বাংলার ইতিহাসে বারো ভূঁইয়াদের আমলও একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজত্বকাল হিসাবে বিবেচিত হয়। এই বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন ঈশা খাঁ। ঈসা খাঁর সময় আরো যারা শীর্ষে ছিলেন তারা হলেন- যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য, চন্দ্রদ্বীপের কন্দর্পনারায়ণ, বিক্রমপুরের চাঁদ রায় ও কেদার রায় এবং ভাওয়ালের ফজল গাজী ও চাঁদ গাজী।

ক্রমে ঈসা খাঁ বাংলায় এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠেন যে, স্বাধীন সম্রাটের মতই তিনি রাজ্য শাসন করতেন। তার বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্যের সংবাাদ চলে যায় দিল্লির মুঘল সম্রাটের কাছে। দিল্লির সম্রাট শঙ্কিত হয়ে পড়েন। বাংলার সুবাদার করে পাঠান শাহবাজ খাঁকে। জঙ্গলবাড়ির যুদ্ধে শাহবাজ খাঁকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন বীর ঈশা খাঁ।

এরপর ১৫৯৭ সালে সেনাপতি মানসিংহ বিশাল মোঘল বাহিনী নিয়ে ঈসা খাঁকে দমন করতে ধেয়ে আসেন। ঈসা খাঁ প্রস্তুতি নিয়ে আস্তানা গাড়েন এগারোসিন্ধুর দুর্গে। রাজা মানসিংহ দুর্গের নিটক হাজির হলে যুদ্ধ চলে তুমুল গতিতে। রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধে মানিসিংহের জামাতা দুর্জয় সিংহ নিহত হয়। প্রতিশোধের নেশায় সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান জানান ঈসা খাঁকে।

যুদ্ধে মানসিংহের তরবারি দ্বিখন্ডিত হলো। হতবাক হয়ে পড়লেন রাজা মানসিংহ। দুর্ধর্ষ বীর ঈসা খাঁ এক আঘাতেই মানসিংহের মাথা দ্বিখন্ডিত করে দিতে পারতেন। কিন্তু তরবারি নামিয়ে শত্রুর কাছে গিয়ে বললেন, নিরস্ত্রকে হত্যা করা ইসলামের রীতি নয়। এই নিন তরবারি। শক্তি পরীক্ষা করুন শেষ পর্যন্ত। যুদ্ধের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে জয় পরাজয়।

ঈসা খাঁর কথা শুনে মানসিংহ অবাক হলেন। সারা জীবন যুদ্ধ করে এমন কথা শুনেননি কখনো। এমন হৃদয়বান বীর জীবনে দেখেননি। ‘এমন বীরের সাথে আর যুদ্ধ নয়। আমি আপনার শৌর্য-বীর্যে মুগ্ধ ও অভিভূত। আমি পরাজয় স্বীকার করলাম। সত্যিই আপনি অদ্বিতীয় বীর’। এরকম মন্তব্য ছিল মানসিংহের। এরপর থেকে মাথা উঁচু করেই রাজ্য শাসন করেন ঈসা খাঁ।

ঈসা খানের মৃত্যু


ঈসা খান বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম কেদার রায়ের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করলে কেদার রায় ঈসা খানের রাজধানী আক্রমণ করেন। ঈসা খাঁ আক্রমণের ভয়ে মেদিনীপুর পালিয়ে যান। ঈসা খানের জমিদারি দখল করে নেন। ঈসা খান অজ্ঞাত রোগে ১৫৯৯ সালে মারা যান। গাজীপুর জেলার বক্তারপুর নামক গ্রামে তার সমাধি রয়েছে।

ঈসা খাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী সোনাবিবিও শক্তভাবে রাজ্য পরিচালনা করেন। তাঁর বীরঙ্গনার খ্যাতিও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এবার চাঁদ রায় ও কেদার রায় ত্রিপুরার রাজার সাথে মিলিত হয়ে আক্রমণ করে ঈশা খাঁর সুরক্ষিত সোনাকুণ্ডা দুর্গ। বীরাঙ্গনা সোনাবিবি প্রতিজ্ঞা করলো জীবন দেবো তবু বন্দী হবো না। যুদ্ধ ক্ষেত্রেই সোনাবিবি জীবন দিয়ে স্বামীর গৌরব ধরে রাখলেন।

বাংলায় বারো ভূইয়াদের পরিচয়


মুঘল আমলে বাংলার ইতিহাসে বারো ভূ্ইঁয়াদের দুঃসাহসী অধ্যায়ের সূচনা হয়। কারন এই বারো ভূঁইয়ারা ছিল বীরযোদ্ধা। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী। মুঘল শাসকদের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তারা ছিল সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ। ক্রমান্বয়ে ঈসা খাঁ এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠেন যে, পাশ্ববর্তী রাজারাও তাকে যমের মত ভয় করতো।

ঈসা খাঁর আমলে সোনারগাঁও বাংলার রাজনৈতিক পরিমন্ডলে খ্যাতির শীর্ষে আরোহন করেন। সোনারগাঁয়ের প্রাচীন নাম সুবর্ণগ্রাম থেকে মুসলিম আমলে সোনারগাঁও নামের উদ্ভব। প্রবাদ আছে- এ অঞ্চলে স্বর্ণ বৃষ্টি হয়েছিল বলে এ স্থানটি সুবর্নগ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করে। আবার ঐতিহাসিকদের মতে, ঈসা খাঁর স্ত্রী সোনাবিবির নামানুসারে সোনারগাঁও নামের উদ্ভব।

বঙ্গ বিজেতা বখতিয়ার খলজির ১২০৩ সালে বাংলা জয়ের মধ্য দিয়ে সোনারগাঁয়ে মুসলিম আধিপত্য সূচিত হয়। ১৩৩৮ সালে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ বাংলার পূর্বাঞ্চলে সোনারগাঁকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন এবং পূর্ব বাংলার স্বতন্ত্র রাজধানী হিসাবে প্রথম মর্যাদা লাভ করে। এই সোনারগাঁয়ের মধ্য দিয়েই ষোঁড়শ শতকে নির্মিত হয় শেরশাহ সুরীর ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড।

বিশ্ববিখ্যাত মসলিনের জন্য সোনারগাঁয়ের সুখ্যাতি ছিল। এ ছাড়া জামদানি শিল্প, মলমল বস্ত্র, সোনা রূপার অলংকার ইত্যাদি পণ্য সামগ্রিতে ভরপুর ছিল তৎকালীন সোনারগাঁ। দিল্লি-আগ্রা ও আরব বিশ্ব থেকে আসা বণিকরা এখানে এসে ভিড় করতো। কথিত আছে সোনারগাঁর নদী স্রোতে অবিরাম ঝিকঝিক করে ভেসে যায় সোনারেণূ।

সোনারগাঁয়ের প্রায় সব সুলতানই জ্ঞানী-গুণী, ধার্মিক ও সাহিত্যিকদের খুবই কদর করতেন। ফলে দিল্লি, আজমীর, আরব বিশ্ব থেকে জ্ঞানী-গুণী, পীর-ওলী ও সুফি সাধকরা এখানে আসতেন। সোনারগাঁয়ের অধিবাসীদের তখন ছিল স্বর্ণযুগ। ইবনে বতুতাও এ অঞ্চল দিয়ে চীন সফর করেছেন। একটি সমৃদ্ধ রাজধানীর সকল বৈশিষ্ট্যই ছিল সোনারগাঁয়ের।

ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁ সোনারগাঁ ও তার আশপাশ এলাকা বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ সুরক্ষিত করে মুঘলদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন কিছুকাল পর্যন্ত। মুঘল সম্রাট আকবরের সুবাদার শাহবাজ খাঁকেও পরাজিত করেছিলেন ঈসা খাঁ। ১৬১১ সালে সোনারগাঁ ইসলাম খানের দখলে আসলে সোনারগাঁ রাজধানীর মর্যাদা হারিয়ে ক্ষয়িষ্ণু শহরতলীতে পরিণত হয়।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url