২১ ফেব্রুয়ারি বাঙ্গালির প্রেরণা ও অবিস্মরণীয় একটি দিন
২১ ফেব্রুয়ারি বাঙ্গালি জাতির চির প্রেরণা ও অবিস্মরণীয় একটি বিশেষ দিন। জাতীর জীবনে শোকাবহ, গৌরবোজ্জল, অহংকারে মহিমান্বিত চিরভাস্বর এই দিনটি। তাই এ দিনটি প্রেরণার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। শুধু এ দেশেই নয়, এখন এটি সারা বিশ্বের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে।
ভাষার লড়াইকে কেন্দ্র করে অভ্যুদয় ঘটে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের
১৯৪৭ পরবর্তী আমাদের জাতীয় জীবনের সব জাগরণ, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনার মূলে জড়িয়ে আছে এ মাসের স্মৃতি। ভাষার লড়াইকে কেন্দ্র করে অভ্যুদয় ঘটে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। বিশ্বে এ ধরনের গৌরবের অধিকারী একমাত্র আমরাই। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সবার আগে মনে আসে জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কথা।
এর পরই আসে অধ্যাপক আবুল কাসেম এবং তারই প্রতিষ্ঠিত সংগঠন তমুদ্দুন মজলিসের নাম। এ সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম। তমদ্দুন মজলিস ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে একটি পুস্তিকা আকারে ভাষা আন্দোলনের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে।
অন্যদিকে ১৯৪৭ সালে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করে বক্তব্য দেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করে ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ নামে একটি নিবন্ধ রচনা করেন। এতে তিনি বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে তা রাজনৈতিক পরাধীনতা হবে বলে মত প্রকাশ করেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এ বক্তব্যে তৎকালীন বাঙালিসমাজ উদ্দীপ্ত হয়। ক্রমে দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস। দেশ-বিদেশে সর্বত্র বাড়ছে ফেব্রুয়ারি আর ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক প্রাণচাঞ্চল্য। এ কারনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষা আন্দোলনের উৎসপুরুষ হিসাবে পরিচিত।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঔপনিবেশিক প্রভূত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রথম প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ ঘটে। সেদিন মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষা করতে যেয়ে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত,ও সফিউররা তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে শৃঙ্খলমুক্ত করেছিল দুঃখিনী বর্ণমালা ও মায়ের ভাষা।
ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল তা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। এই দিনটি ঐতিহ্যের পরিচয়কে শক্তভাবে ধারন করে। বাংলা ভাষার রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসন লাভ করেছে।
এ ভাষাতেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাঞ্জলী রচনা করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় বক্তব্য দিয়ে বাংলাকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে গেছেন। ১৯৯৯ সালে ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘ ঘোষণা দেয় প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হবে।
২০০০ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। তবে ১৯৫২ সালের পর থেকে প্রতিবছর এ দিনটি জাতীয় শহীদ দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ সহ সব বাংলা ভাষী জনগণের গৌরবোজ্জল একটি দিন। এটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবেও সুপরিচিত। বাঙালিদের স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
বর্তমানে ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদের সদস্য, উপাচার্য, শিক্ষকবৃন্দ, দুতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন এবং সর্বস্তরের জনগণ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করেন। এ সময় আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি গান বাজতে থাকে।
বাঙ্গালি ছাড়া আর কোনো জাতি তার নিজের ভাষার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেনি বা অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেয়নি। এ কারনে বাঙালির এই মহান অত্মত্যাগকে গোটা বিশ্ব স্মরণ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের মাধ্যমে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ খালি পায়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই ফুল হাতে হাজির হন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে।
২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন হিসাবে ঘোষিত হয়। এ দিন শহীদ দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে রেডিও, টেলিভিশন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাংলা একাডেমি ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে ঢাকায় একুশে বইমেলার আয়োজন করে। ঢকার বাইরেও বিভিন্ন সংগঠন বই মেলার সাথে বিভিন্ন আয়োজন করে থাকে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস
১৯৪৭ সালে ভৌগলিকভাবে পৃথক দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) নামে পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি হয়। সংস্কৃতি ও ভাষার দিক থেকে এই দুটি অংশ সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র জাতীয় ভাষা হিসাবে ঘোষণা করে। যদিও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বাংলা ভাষা ব্যবহার করেন।
পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দু ছাড়াও বাংলাকে কমপক্ষে একটি জাতীয় ভাষা হিসাবে দাবি করে। এই প্রতিবাদ দমনের জন্য পাকিস্তান সরকার জনসভা ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে সাধারণ জনগণের সমর্থনে সভার আয়োজন করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সমাবেশে গুলি চালায়।
এতে সালাম, বরকত, বরকত, রফিক, জব্বার এবং শফিউর নিহত হন এবং আরও শত শত আহত হন। এটি ছিল ইতিহাসের একটি বিরল ঘটনা, যেখানে মানুষ তাদের মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করে। সেই থেকে বাংলাদেশীরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে তাদের দুঃখজনক দিনগুলির মধ্যে একটি হিসাবে উদযাপন করে।
২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতা পুনরায় রাজপথে নেমে আসে। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য গায়েবি জানাজায় অংশগ্রহন করে। হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি সরকার গুড়িয়ে দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারির এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আর ও বেগবান হয়।
১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৭ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। ১৯৮৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ পাশ হয়।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি
কানাডায় বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসাবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণার জন্য জাতিসংঘে ১৯৯৮ সালে আবেদন করেন। জাতিসংঘের এক তথ্য কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে অনুরোধ করেন তিনি যেন জাতিসংঘের অন্য কোন সদস্য রাষ্ট্রের কারো কাছ থেকে একই ধরনের প্রস্তাব আনার ব্যবস্থা করেন।
পরবর্তীতে রফিক ও সালামকে সাথে নিয়ে ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করান। এতে একজন ইংরেজিভাষী, জার্মানভাষী, ক্যান্টোনিভাষী, ও একজন কাচ্চিভাষী সদস্য ছিলেন। তারা কফি আনানকে এ ‘গ্রুপ অব মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ এর পক্ষ থেকে একটি চিঠি লেখেন এবং চিঠির একটি কপি ইউএনওর কানাডীয় দূত ডেভিড ফাওলারের কাছেও প্রেরন করা হয়। এরপর এ প্রস্তাবের সমর্থনে ২৯ টি দেশ অনুরোধ জানায়।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় ও এতে ১৮৮ টি দেশ সমর্থন জানালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে এখন থেকে প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাব পাস হয়।
শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয় শহীদ মিনার এবং গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। এই দিবসটি বাংলাদেশে একটি জাতীয় ছুটির দিন। ভাষা আমাদের বাস্তব ও অস্পষ্ট ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। মাতৃভাষার প্রসারের জন্য বিশ্বজুড়ে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বাংলা ভাষার প্রতি সেন রাজাদের মনোভাব
হাজার বছর আগে বাঙ্গালী জাতির মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছিল সেন রাজারা। সেন রাজাদের হিন্দু পণ্ডিতরা ফতওয়া জারি করে বলেন- ‘যারা বাংলা ভাষা বলবে ও শুনবে তারা রৌরব নামক নরকে যাবে’। এ সময় বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে শুধু ভূমির বিজয় হয়নি, সাথে মুক্ত হয়েছিল বাঙ্গালীদের মুখের ভাষা বাংলা।
ভাষাবিদ দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন- ‘মুসলমান সম্রাটগণ বর্তমান বঙ্গ-সাহিত্যের জন্মদাতা বললে অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ-সাহিত্য, বঙ্গ-ভাষা বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা’। অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন- যদি বাংলায় মুসলিম বিজয় না হতো এবং আগের শাসন কয়েক শতকের জন্য অব্যাহত থাকতো, তবে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেত’।
মধ্যযুগে মুসলিম শাসকদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষার যে সাহিত্য চর্চা শুরু হয়, তার মাধ্যমে বাংলা ভাষা একটি পরিপূর্ণ ভাষা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে বৃটিশরা বাংলা ভাষার আরবী ও ফারসী শব্দ বাদ দিয়ে সংস্কৃত শব্দ প্রবেশের উদ্দেশ্যে সাহিত্য চর্চা শুরু করে। তারা দেখাতে চায়, বাংলা ভাষার সাথে মুসলমানদের কোন সম্পর্ক নাই।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url