বখতিয়ার খলজি প্রথম বাংলা ও বিহার জয় করেন
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি যিনি বখতিয়ার খলজি নামেও সমধিক পরিচিত। তিনি গজনির সুলতান ঘুরির একজন তুর্কি-আফগান সেনাপতি ও প্রাথমিক দিল্লি সালতানাতের সেনাপতি ছিলেন। তিনিই প্রথম মুসলিম হিসাবে বাংলা ও বিহার জয় করেন।
বখতিয়ার বাংলা ও বিহার অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন
তিনিই প্রথম বাংলা ও বিহার অঞ্চলে প্রথম মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। জিয়াউদ্দিন বারানির ইতিহাস গ্রন্থে, আলবিরুনির তহকিকাত এবং ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনীতে বখতিয়ার খলজির কথা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এইসব গ্রন্থে বলা হয়েছে- এই তুর্কি সেনাপতি ও বীর যোদ্ধাই বাংলা ও বিহার অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
বখতিয়ার খলজি যিনি বাংলার খলজি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। বখতিয়ার খলজির ভারতবর্ষে আক্রমণ সমূহ ১১৯৭ থেকে ১২০৬ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সংঘটিত হয়। এইসব আক্রমণে প্রচুর সন্যাসী পালিয়ে যান এবং বৌদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তবে কিছু ঐতিহাসিকগণ মনে করেন বখতিয়ার খলজির আক্রমণে নয় বরং এগুলি আগে থেকেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
বখতিয়ার খলজি ছিলেন মুসলিম খলজি উপজাতির একজন সদস্য, যারা ২০০ বছর আগে তুর্কিস্থান থেকে আফগানিস্থানে এসে বসতি স্থাপন করে। তুর্কি বংশদ্ভুত বখতিয়ার খলজি প্রাথমিক জীবনে একজন ভাগ্যান্বেষী সৈনিক ছিলেন। তিনি আফগানিস্থানের গরমশিরের অধিবাসী ছিলেন। তার বাল্য জীবন সম্পর্কে তেমন জানা না গেলেও মনে করা হয় দারিদ্রের পীড়নে স্বদেশ ত্যাগ করেন।
নিজের কর্মশক্তির উপর নির্ভর করে ভাগ্যান্বেষণে বের হয়ে প্রথমেই মুহম্মদ ঘুরির সৈন্যবাহিনীতে আবেদন করেও সফল হয়নি। এখানে ব্যর্থ হয়ে দিল্লিতে কুতুবুদ্দীন আইবেকের দরবারে উপস্থিত হন। এখানেও চাকরি লাভে ব্যর্থ হন। অবশেষে বাদাউনের শাসনকর্তা মালিক হিজবর উদ্দীন নগদ বেতনে সেনাবাহিনীতে চাকরি দেন।
উচ্চাভিলাষী বখতিয়ার খলজি অল্প বেতনে পরিতৃপ্ত হতে পারেননি। অল্পকাল পর তিনি বদাউন ত্যাগ করে অযোদ্ধায় গমন করেন। অযোদ্ধার শাসনকর্তা হুসামউদ্দিন তাকে ভগবৎ ও ভিউলি নামক দুইটি পরগনার জায়গির প্রদান করেন। এখানেই বখতিয়ার খলজি তার ভবিষ্যৎ উন্নতির একটা জায়গা খুঁজে পান এবং এই দুইটি পরগনাই তার শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।
বখতিয়ার খলজির বিহার বিজয়
বখতিয়ার খলজির রণকৌশল ছিল খুবই চমৎকার ও অতুলনীয়। তার রণকৌশলের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল দ্রুতগতি। তিনি খুব অল্পসংখ্যক সেনা নিয়ে শত্রুর দুর্বল স্থানে আক্রমণ করতেন, যা শত্রুপক্ষকে অবাক করে দিত। তিনি এমন সময় এবং এমন স্থানে আক্রমণ করতেন, যা শত্রুর কল্পনার বাইরে ছিল। তিনি শক্তির তুলনায় কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
১২০১ সালে বখতিয়ার খলজি মাত্র দুই হাজার সৈন্য সংগ্রহ করে পাশ্ববর্তী রাজ্যগুলি আক্রমণ করতে থাকেন। সেই সময় তার বীরত্বের কথা চারিদিক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মুসলিম সৈন্য তার বাহিনীতে যোগ দিতে থাকলে তার সৈন্য সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি একদিন প্রাচীর বেষ্টিত এক দুর্গে বিনা বাধায় আক্রমণ করেন।
দুর্গজয়ের পর তিনি দেখেন যে দুর্গের অধিবাসীরা প্রত্যেকেই মুন্ডিত মস্তক এবং দুর্গটি বইপত্র দিয়ে ভরা। পরে তিনি জানতে পারেন যে এটি একটি বৌদ্ধ বিহার। সেই সময় থেকেই মুসলমানরা জায়গাটিকে বিহার বা বিহার শরিফ নামে ডাকে। বিহার জয়ের পর বখতিয়ার খলজি বাংলা জয়ের জন্য মনস্থির করেন এবং শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন।
বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়
বাংলার রাজধানী নদিয়া ছিল বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল। তৎকালীন বাংলার রাজা লক্ষণসেন নদিয়ায় অবস্থান করছিলেন। লক্ষণসেনের রাজসভার কিছু পণ্ডিত তাকে সতর্ক করে বলেন, এক তুর্কি সৈনিক তাকে পরাজিত করতে পারেন। ফলে তার মনে ভীতির সঞ্চার হয় এবং নদিয়ার প্রবেশ পথগুলির নিরাপত্তা জোরদার করেন।
লক্ষণ সেনের ধারনা ছিল যে ঝাড়খণ্ডের শ্বাপদশংকুল অরণ্য দিয়ে আক্রমণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বখতিয়ার সেই পথেই এত দ্রুত গতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে তার সাথে মাত্র ১৭ জন সৈনিক তাকে অনুসরণ করতে পেরেছিলেন। বখতিয়ার ছদ্দবেশে রাজা লক্ষণসেনের প্রাসাদদ্বারে উপস্থিত হন এবং প্রহরীদের হত্যা করে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করেন।
প্রাসাদের ভিতরে হৈ চৈ পড়ে যায়। লক্ষণ সেন হতাশ হয়ে দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলে। প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে নৌপথে বিক্রমপুরে আশ্রয় নেন। খলজি নদিয়া জয় করে লক্ষণাবতীর (গৌড়) দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানেই রাজধানী স্থাপন করেন। গৌড় জয়ের পর আরও পূর্বদিকে বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলায় নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।
বখতিয়ার খলজির তিব্বত অভিযান
বখতিয়ার খলজির রাজ্য পূর্বে তিস্তা নদী ও করতোয়া নদী, দক্ষিণে পদ্মা নদী, উত্তরে দিনাজপুর জেলার দেবকোট হয়ে রংপুর শহর পর্যন্ত এবং বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যদিও বাংলাদেশের বৃহদাংশ তার রাজ্যের বাইরে ছিল। সেসব অঞ্চল দখল না করে তিনি তিব্বত আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। তিব্বত আক্রমণের রাস্তা আবিস্কারের জন্য বখতিয়ার বাংলার উত্তর-পূর্বাংশের উপজাতি গোষ্ঠীর সদস্য আলী মেচকে নিয়োগ দেন।
সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে প্রায় ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে তিব্বতের দিকে রওনা দেন। অনেক চওড়া বেগমতি নদী পার না হয়ে নদীর তীর ধরে তিন দিনের দূরত্ব অতিক্রম করার পর একটি পাথরের সেতুর নিকটে আসেন। সেখানে দুজন সেনাপতিকে সেতুর সুরক্ষায় রেখে সামনে অগ্রসর হন। সামনে একটি কেল্লার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে বখতিয়ার জয়ী হন।
যুদ্ধে জয়ী হলেও সৈন্যবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। তিনি জানতে পারেন কেল্লার অদূরে কয়েক লক্ষ সৈন্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। বখতিয়ার সামনে অগ্রসর না হয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। সেতুর কাছে এসে দেখে পর্বত্য লোকেরা তার দুই সেনাপতিকে হত্যা করেছে। এরপর অল্প সংখ্যক সৈন্য সহ ফিরে আসতে সক্ষম হন। তার তিব্বত অভিযান ব্যর্থ হওয়ায় মানষিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন।
বখতিয়ার খলজির মৃত্যু
তিব্বত অভিযান ব্যার্থ হলে বখতিয়ার দেবকোটে ফিরে আসেন। মুসলিম রাজ্যের প্রজাদের মধ্যে বিদ্রোহ বিরোধ দেখা দিতে শুরু করে। বাংলার ছোট ছোট মুসলিম রজ্যগুলো দিল্লীর সাথে বিরোধে কোনঠাসা হয়ে পড়ে। এরকম নানাবিধ চিন্তা এবং পরাজয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অল্প কিছুদিন পর ১২০৬ সালে শয্যাশায়ী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
ইসলামী ইতিহাসের উজ্জল সিপাহসালার বখতিয়ারের সমাধিস্থল আজও অবহেলিত ও অনেকটাই অজ্ঞাত। বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বখতিয়ার খলজি বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় ঘুমিয়ে আছেন। মুসলিম শাসনামলের বহু স্থাপনার মতোই অযত্নে-অবহেলায় এখনো টিকে আছে তার সমাধিসৌধ।
বখতিয়ার খলজি ১৭ জন ঘোড়সওয়ার সৈনিক নিয়ে অত্যাচারী শাসক লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করেন। শান্তি, সৌহার্দ, উন্নয়ন-অগ্রগতি ও আদর্শের ছৌয়ায় গড়ে ওঠা সমাজে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য রচিত হয় শান্তির নীড়। বিশ্ব দরবারে বাংলার পরিচিতি ও সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। জান্নাতুল বালাদ বা প্রাচ্যের স্বর্গ হিসাবে ভূষিত হয়।
মুসলিম শাসকদের বাংলা ভাষায় পৃষ্টপোষকতা
হাজার বছর আগে বাঙ্গালী জাতির মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছিল সেন রাজারা। সেন রাজাদের হিন্দু পণ্ডিতরা ফতওয়া জারি করে বলেন- ‘যারা বাংলা ভাষা বলবে ও শুনবে তারা রৌরব নামক নরকে যাবে’। এ সময় বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে শুধু ভূমির বিজয় হয়নি, সাথে মুক্ত হয়েছিল বাঙ্গালীদের মুখের ভাষা বাংলা।
ভাষাবিদ দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন- ‘মুসলমান সম্রাটগণ বর্তমান বঙ্গ-সাহিত্যের জন্মদাতা বললে অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ-সাহিত্য, বঙ্গ-ভাষা বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা’। অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন- যদি বাংলায় মুসলিম বিজয় না হতো এবং আগের শাসন কয়েক শতকের জন্য অব্যাহত থাকতো, তবে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেত’।
মধ্যযুগে মুসলিম শাসকদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষার যে সাহিত্য চর্চা শুরু হয়, তার মাধ্যমে বাংলা ভাষা একটি পরিপূর্ণ ভাষা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে বৃটিশরা বাংলা ভাষার আরবী ও ফারসী শব্দ বাদ দিয়ে সংস্কৃত শব্দ প্রবেশের উদ্দেশ্যে সাহিত্য চর্চা শুরু করে। তারা দেখাতে চায়, বাংলা ভাষার সাথে মুসলমানদের কোন সম্পর্ক নাই।
বাংলায় মুসলমান শাসনের ইতিহাসে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রচেষ্টাতেই এ দেশে প্রথম মুসলমানদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শাসন প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছরের অধিক (১২০৪-১৭৬৫) স্থায়ী হয়েছিল। রাজ্য জয় করেই ক্ষান্ত ছিলেন না। ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশে তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url