ক্রুসেড বলতে মূলত বোঝায় ধর্মযুদ্ধ

হাজার বছর ধরে চলা ক্রুসেডের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। গাজী সালাউদ্দীন আইয়ুবী ক্রুসেডের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল। এক দিকে সশস্ত্র লড়াই, অন্যদিকে কুটিল সাংস্কৃতিক হামলা- এ দুয়ের মোকাবেলায় রুখে দাঁড়াল মুসলিম বীর শ্রেষ্ঠরা।

ক্রুসেড বলতে মূলত বোঝায় ধর্মযুদ্ধ

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস যুগান্তকারী ও সুদুরপ্রসারী


পবিত্রভূমি জেরুজালেমের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে ইউরোপের খৃস্টান ও প্রাচ্যের মুসলমানদের মধ্যে একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ২০০ বছরব্যাপী যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তা ইতিহাসে ক্রুসেড নামে পরিচিত। মধ্যযুগে এশিয়া ও ইউরোপের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী অধ্যায় এবং এর ফলাফলও ছিল সুদুরপ্রসারী।

খৃস্টানগণের ধর্মীয় নেতা পোপের নির্দেশে বুকে ক্রস চিহ্ন নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল এবং ক্রসকেই যুদ্ধের পতাকাতে ব্যবহার করেছিল বলেই ইতিহাসে এ যুদ্ধ ক্রুসেড নামে পরিচিত। মুসলমান ও খৃস্টানদের দীর্ঘদিনের ঘৃণা, বিদ্বেস ও দ্বন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এই ধর্মযুদ্ধে। এ যুদ্ধকে আজও সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা হিসাবে দেখা হয়।

ক্রুসেডের প্রেক্ষাপট


ক্রুসেড বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঐতিহাসিক পিকে হিট্টি বলেন- ‘চার্চের ক্রস, সৈনিকের তরবারি এবং বণিকদের অর্থভান্ডার মিলিত হয়ে ক্রুসেডের সূত্রপাত করেছিল।’ সপ্তম শতক থেকে জেরুজালেমের উপর আরব মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সেলজুক তুর্কিরা খৃস্টান তীর্থযাত্রীদের উপর অত্যাচারের ফলে ক্রুসেডের প্রেক্ষাপট তৈরী হয়।

ক্রুসেড বলতে মূলত বোঝায় ধর্মযুদ্ধ। তবে ক্রুসেড কেবল ধর্মযুদ্ধ ছিল না। বরং ভৌগলিক ও ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবাদ থেকে ক্রুসেডগুলো সংঘটিত হয়েছিল। তাছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও ক্ষমতা বিস্তার ছিল ক্রুসেড সংঘটিত হওয়ার অন্যতম কারন।

জেরুজালেম উভয়ের কাছে পবিত্র ভূমি


মসজিদুল আকসা বায়তুল মুকাদ্দাস নামেও পরিচিত। এ মসজিদটি ফিলিস্তিনের প্রাণকেন্দ্র পবিত্র জেরুজালেম নগরীতে অবস্থিত। এই প্রাচীন মসজিদটি হযরত সুলাইমান (আ.) নির্মান করেন। মক্কা শরীফের পরেই এ মসজিদের গুরুত্ব। আল্লাহ মহানবী সা. কে মিরাজের রাতে এ মসজিদ থেকে ঊর্ধাকাশে ভ্রমণ করান। এটি অনেক নবী-রাসূলের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। 

জেরুজালেম মুসলিমদের কাছে পবিত্র ভূমি হিসাবে পরিচিত। এ শহরের আল-আকসা মসজিদ মুসলিমদের কাছে প্রধান তীর্থস্থান। খৃস্টানদের কাছেও জেরুজালেম শহরটি পবিত্র ভূমি। খৃস্টানদের বিশ্বাস যিশু খৃস্টের মৃত্যু এবং তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিল এই শহরেই। শত শত বছর ধরে খৃস্টানদের প্রার্থনার এই পবিত্র ভূমি মুসলমানদের অধীনে চলে আসে।

মুসলিমদের দখলে থাকলেও জেরুজালেমের তীর্থস্থানে খৃস্টানরা অনায়াসে যেতে পারত। কিন্তু ১০৭৭ সালে আনাতোলিয়ার সেলজুক শাসকরা খৃস্টানদের জেরুজালেমে যেতে বাধা দেয়। সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রসার কনস্টান্টিনোপলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ১০৯৫ সালে পোপ দ্বিতীয় আরবান এক জ্বালাময়ী বক্তব্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করেন।

পোপের এই ঘোষণার পর তারা ধর্মযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তিনি বলেন- ‘খৃস্টানরা যদি জেরুজালেম উদ্ধার করতে যুদ্ধে যান, তাহলে ঈশ্বর তাঁদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন’। ইউরোপের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের অর্জিত ভূমি এবং বাণিজ্যিক কারনে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধে প্রলুব্ধ করেছিলেন। ফলে সাধারণ মানুষও অস্ত্র হাতে তুলে নেয়।

দুই শতাব্দী ধরে চলা আটটি ক্রুসেডের মধ্যে প্রথমটি শুরু হয় ১০৯৬ সালে। পবিত্র ভূমিতে যাওয়ার সময় তাঁরা বহু নিরপরাধ লোককে হত্যা করে জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হয়। নিহত মানুষদের মধ্যে অনেক শিশু ও নারী ছিল। এমনকি ইহুদিদেরও হত্যা করা হয়। ক্রুসেডার বাহিনী জেরুজালেম দখল করে সেখানে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

ক্রুসেডের কারন


১১ শতকে শক্তির ভারসাম্য পশ্চিমের দিকে হেলতে শুরু করে। রাজারা রাষ্ট্রে বিশপদের নিয়োগ দিতে শুরু করে। এই প্রথম জনমতকে নিজেদের পেছনে একতাবদ্ধ করতে সক্ষম হন। বণিক শ্রেণীরা পার্থিব অভিলাষ ও পবিত্র ভূমি রক্ষার্থে ব্যয়ভার বহনে উপযোগী হয়ে ওঠে। ফলে ক্রুসেড আরাম্ভ করা সহজ হয়ে ওঠে।

ইসলামকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলার চক্রান্তে মেতে উঠে খৃস্টানরা। একে একে লোমহর্ষক অসংখ্য সংঘাত ও সংঘর্ঘে পরাজিত হয়ে বেছে নিয়েছিল ষড়যন্ত্রের পথ। মুসলিম দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিয়েছিল গুপ্তচর বাহিনী, মদ ও নেশার দ্রব্য। কেবল সশস্ত্র সংঘাত নয়, চরিত্র হননের স্রোত বইয়ে দিয়েছিল মুসলিম দেশগুলোর সর্বত্র।

মুসলমানদের অব্যাহত বিজয়


মহানবী সা. এর তিরোধানের পর থেকে ১০০০ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানদের বিজয় অব্যাহত থাকে। মিশর, ইরাক, ইরান, আফগানিস্থান, জেরুজালেম সহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। রাজ্য শাসনের পাশাপাশি মুসলিম শাসকগণের শিক্ষা বিস্তারের ফলে অন্ধকার আফ্রিকা ও ইউরোপ জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে।

মুসলিম নেতৃত্বে ইউরোপ হয়ে ওঠে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার। এ সময় আফ্রিকা ও ইউরোপে মুসলিম সামরিক বাহিনী অজেয় শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। রাজ্য জয়, রাজ্যশাসন ও সেনাবাহিনী গঠনে মুসলমানরা অসামান্য ভূমিকা প্রদর্শন করে। ইহুদী-খৃস্টানরা একে একে রাজ্য হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। অবশ্য অনেকে ইসলাম গ্রহন করে।

ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচার ও প্রোপাগান্ডা


ইহুদী ও খৃস্টানরা তাদের ভূমিতে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় হিংসা আর ক্রোধের আক্রোশে তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর মহাপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে। মুসলিম জাতিকে শিক্ষাবিমুখ ও ধর্মহীন বানানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়। প্রথমে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচার ও প্রোপাগান্ডা চালাতে শুরু করে।

অল্প সময়ের মধ্যে গুপ্তচর বাহিনীর নেটওয়ার্ক ইসলামী দুনিয়াকে জালের মত ছেয়ে ফেলে। সেবার নামে ধর্মচ্যুতির এক মহা ফাঁদ আবিস্কার করে। সেবার নামে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মের মাধ্যমে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের মগজ ধোলাই করে। তাদের সামনে উন্নতি আর প্রগতির প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। ইসলামের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে নকল ইসলাম তৈরি করে।

একদিকে কুটিল সাংস্কৃতিক আগ্রাসন অন্যদিকে সশস্ত্র হামলা। ধ্বংসাত্মক মানবতাবিরোধী কর্মসূচি নিয়ে তারা নিরীহ মানবতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নেয়। এ সময় খৃস্টানদের পোপ ছিল দ্বিতীয় আরবান। তিনি ১০৯৫ সালে ফ্রান্সে এক সম্মেলনে খৃস্টান বিশ্বকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলেন। খৃস্টানরা এ যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেড বলে।

জেরুজালেম অবরোধ ও নৃশংসতা


১০৯৯ সালে জেরুজালেম দখলের মধ্য দিয়ে ক্রুসেড শুরু হয়। ক্রুসেডারগণ ৪০ দিন যাবত জেরুজালেম অবরোধ করে রাখে। এত দিনের অবরোধে ক্রুসেডারগণ রক্ত তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী রেমন্ড দ্য এজিলেস নৃশংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন এভাবে- ‘মসজিদের বারান্দায় মানুষের হাটু পরিমান রক্ত জমে গিয়েছিল। আর ঘোড়ার লাগাম পর্যন্ত রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।’

ক্রুসেডারদের হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস চূড়ান্ত পদানত হলো। খৃস্টানরা বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করলো। তারা মসজিদকে গির্জায় পরিণত করলো। এভাবেই মুসলিম শাসনের গৌরবময় ৪৬২ বছরের পতন ঘটলো। জেরুজালেম রক্ষায় কোন মুসলিম শাসক এগিয়ে আসেনি। তারা নারী ও মদ নিয়ে অন্তপুরে ফুর্তিতে ব্যস্ত সময় পার করছিল।

এক মুসলিম মহাবীরের আগমন


ঠিক এ সময় মুসলিম জাতিকে উদ্ধার করতে আগমন ঘটে এক মহাবীরের। আবু-নাসির সালাহউদ্দীন ইউসুফ ইবনে আইয়ুবী (রহ.) এর নেতৃত্বেই মুসলিমগণ বায়তুল মুকাদ্দাস উদ্ধার করেছিলেন। আর জেরুজালেমকে মুক্ত ও স্বাধীন করেছিলেন। মহাবীর সালাহউদ্দীন ক্রুসারদের নিয়ন্ত্রিত প্রায় সকল শহর জয় করেন। রক্তপাতহীনভাবে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন।

এ বিজয়ের মাধ্যমে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেন। বাইতুল মুকাদ্দাস ও জেরুজালেমে খৃস্টানদের মহা বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। স্থাপিত হয় মুসলিম শাসন। কিন্তু খৃস্টান শক্তি পোপ আরবানের নেতৃত্বে সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ও জার্মান এই তিন খৃস্টীয় শক্তিও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়।

এই তিন পরাশক্তি জেরুজালেমকে ধ্বংসলীলায় পরিণত করতে উদ্যত হয়। এ লক্ষে তারা ৬ লক্ষ সৈন্যের সমাবেশ ঘটায়। অপরপক্ষে সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর সৈন্য সংখ্যা মাত্র ২০ হাজার। খৃস্টান বাহিনী মুসলিমদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। ১১৮৯ সালে অবরোধ শুরু হয়ে চলে টানা তিন বছর। সালাহউদ্দীন আইয়ুবী পাহাড়ের মত অটল হয়ে থাকেন।

আল্লাহর উপর অটুট বিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে সফলভাবে মোকাবেলা করলেন এই দীর্ঘ অবরোধ। আল্লাহর সাহায্য নাযিল হল। ফলে ৬ লাখের বিশাল সৈন্য বাহিনী ক্রমাগত মনোবল হারিয়ে ফেলে ও দর্বল হয়ে পড়ে। ১১৯২ সালে খৃস্টান বাহিনী অবরোধ তুলে নেয় এবং তারা নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এরপর শত বছর চেষ্টা করেও খৃস্টানরা আর জেরুজালেম দখল করতে পারেনি।

ক্রুসেডের অবসান


ইতিহাসবীদ অধ্যাপক ড. সোনিয়া নিশাত আমিন বলেছেন-ক্রুসেডে কে জিতেছে কে হেরেছে, সেটার সহজ উত্তর নাই। বহু বছরের যুদ্ধে উভয়পক্ষ হয়তো বুঝতে পেরেছিল যে এখানে ইতি টানা দরকার। যখন ১২৯১ সালে ক্রুসেডারদের সর্বশেষ নিয়ন্ত্রিত শহর আর্ক মামলুকদের দখলে চলে যায়, এর মধ্যদিয়ে ক্রুসেডারদের শাসনও শেষ হয়ে যায়।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url